তুরস্কে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বয়ানে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা

তুরস্কে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বয়ানে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা

‘হঠাৎ খাট কেঁপে উঠল। ঘুম ভেঙে দেখি, আমার রুমমেটও জেগে গেছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেকের চিৎকার কানে আসছিল। নিজেরা কী করব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। আড়াই থেকে তিন মিনিট খাটের ওপরই বসে ছিলাম। পরে শীতের কাপড় পরে রুমমেটকে নিয়ে নিচে নামি। তখন সিঁড়িতে দেখি, ভবনের পলেস্তারা খসে পড়েছে, সিঁড়িও ফাটা, ভবনের অন্তত ছয় জায়গায় ফাটল। এর মধ্যেই বাইরে গিয়ে প্রচণ্ড শীতে কাঁপছিলাম। এমন একটি ভোর তুরস্কের কেউ আশা করেনি হয়তো।”

কথাগুলো বলছিলেন তুরস্কে ভয়াবহ ভূমিকম্পকবলিত প্রদেশ গাজিয়ান্তেপে অবস্থান করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুদ। তিনি তুরস্কের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট কমিউনিটি অব গাজিয়ান্তেপ ইউনিভার্সিটির সভাপতি।

ফয়সাল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি গাজিয়ান্তেপ ইউনিভার্সিটির উম্মে কুলসুম স্টুডেন্ট ডরমিটরিতে থাকি। ১২ তলা ভবনটির পঞ্চম তলার একটি কক্ষে রুমমেট ও আমি ঘুমাচ্ছিলাম। ঘুম ভাঙার পরে আসলে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, বাইরে কী হচ্ছে না হচ্ছে। পরে বুঝলাম ভূমিকম্প হচ্ছে। বের হওয়া জরুরি মনে হলেও বাইরে প্রচণ্ড শীতের কথা ভেবে অপেক্ষা করছিলাম। পরে ঝুঁকি নিয়েই বের হই।’

ফয়সাল বলেন, ‘নিচে গিয়ে দেখি, নিরাপত্তার জন্য পার্শ্ববর্তী মসজিদ আর ইউনিভার্সিটির একটি বিভাগ খুলে দেওয়া হয়েছে। আমরা বাঙালিরাসহ কয়েকজন মসজিদে অবস্থান নিই। অনেকে ইউনিভার্সিটিতে আশ্রয় নিয়েছে। ঘণ্টাখানেক পর যখন নিজেদের জরুরি জিনিস নিতে হোস্টেল ভবনে উঠি, তখন ভূমিকম্পের আফটারশক হচ্ছিল। সাধারণত ভূমিকম্প হলে আধাঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তখনো হয়নি। পরে জানিয়ে দেওয়া হলো স্টুডেন্টদের হোস্টেলে না থাকতে। আমরা আবার মসজিদে চলে যাই। এরপর দুপুর ১টা পর্যন্ত (স্থানীয় সময়) ৮০ বারের বেশি ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে। প্রতিবারই ভবনের ঝাঁকুনির সঙ্গে দেখছিলাম মসজিদের ল্যাম্পগুলো অনেক জোরে দুলছিল।’

তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের ভয়ের সঙ্গে সবচেয়ে কষ্টের হচ্ছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, বৃষ্টি ও বরফ। ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে খোলা জায়গায় যাওয়া জরুরি হলেও বাধ্য হয়ে ভবনেই থাকতে হচ্ছে।’

গাজিয়ান্তেপের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেট সেবার বিষয়ে ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘গাজিয়ান্তেপে এখন পর্যন্ত (স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা) সব ধরনের ইউটিলিটি সেবা স্বাভাবিক রয়েছে। ইউনিভার্সিটির স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনায় এসব ইউটিলিটি সার্ভিস হওয়ার কারণে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এ ছাড়া তুরস্কের ইউটিলিটি সার্ভিসগুলো মাটির নিচ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে করা। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোতে দুর্যোগের কথা মাথায় রেখেই বিদ্যুৎ-গ্যাসের লাইন করা হয়েছে। আবার যেসব প্রদেশে ভূমিকম্প হয়েছে, সেখানে সরকার আলাদা করে ভ্রাম্যমাণ ইন্টারনেট সেবাও দিচ্ছে।’

ভূমিকম্প এবং সেখানকার বাংলাদেশিদের অবস্থা সম্পর্কে তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক মিনহাজ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র এবং মসজিদে অবস্থান নিয়েছে। গাজিয়ান্তেপের একটা মসজিদে ১০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে রয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ভালো আছেন। তবে যে প্রদেশগুলোতে ভূমিকম্প হয়েছে, সেখানে ৫০ জন বাংলাদেশি রয়েছেন, যাঁদের প্রায় সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও দু-তিনজনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আদানা (দুপুর ১টা ১০ মিনিট স্থানীয় সময়) প্রদেশে আমার সামনে ১৪ তলা একটি ভবনের উদ্ধারকাজ চলছে। লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। বাঙালিসহ তুরস্কে অবস্থানকারীরা আতঙ্কের মধ্যে আছে। ভূমিকম্পের পর আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক মন্দা—এ দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইস্তাম্বুলের মতো শহরে গতকাল (৫ ফেব্রুয়ারি) মাইনাস সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। অন্যান্য অনেক প্রদেশে একদিকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আবার তুষার ঝড় হচ্ছে। এ রকম একটি তুষার ঝড়ের মধ্যে এত বড় একটি ভূমিকম্প হয়েছে।’

তিনি বলেন, “গতকাল (রবিবার) তুরস্কের বেশির ভাগ অঞ্চলের আকাশে মেঘের ঘনঘটা ছিল। হঠাৎ করে ভূমিকম্প আঘাত হানে। অনেকে নিজের জায়গা থেকে সরতে পারেনি, তাদের অনেকে মারা গেছে। অনেক লাশ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে। মিনহাজ বলেন, “আমার পরিচিত শাহাব উদ্দিন নামের এক বাংলাদেশি নাগরিকের বাসস্থানের দুই পাশে দুটি ভবন ধসে গেছে। তাই তাঁদের আতঙ্ক কাটছে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *