ঈদ-উল ফিতরের করনীয় ও কিছু আমল

ঈদ-উল ফিতরের করনীয় ও কিছু আমল

ঈদ-উল ফিতরের করনীয় ও কিছু আমল

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে ঈদ-উল ফিতর হচ্ছে বান্দার জন্য খুশির একটি দিন। আল্লাহ্‌ তা’আলার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি উপহার। এ উপহারটি যেন আল্লাহ্‌র আনুগত্য করার জন্যই পাওয়া। এ খুশি যেন বিগত জীবনের সকল গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারার জন্যই। ঈদের দিন আনন্দিত ও হাসিখুশি থাকা একটি সুন্নাহ। এদিন আনন্দিত ও হাসিখুশি থাকা এবং অপরকে হাসিখুশি থাকাও ইবাদত।

চলুন জেনে নেই ঈদের দিনের করনীয়-বর্জনীয় ও কিছু আমল

ঈদের দিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও আমল যা বিভিন্ন হাদীস দ্বারা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর বেশ কিছু কাজের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেগুলো থেকে কয়েকটি আমল তুলে ধরা হল।

১) তাকবীরে তাশরীফ- ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে পরদিন ঈদের নামাজের আগ পর্যন্ত তাকবীরে তাশরীফ বলা বা পড়া মুস্তাহাব।

তাকবীরে তাশরীফ- لله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله، والله أكبر الله أكبر ولله الحمد

আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।

২) ঈদের সালাতের আগেই ফিতরা আদায় করা- ঈদের সালাতের আগেই ফিতরা আদায় করে দিতে হয় যাতে দরিদ্র লোকেরা ঈদের দিন অন্যের কাছে হাত না পাতে। (সাদাকাতুল ফিতরের বিস্তারিত জানতে এই লেখায় ক্লিক করুন)

৩) খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা ও আগে আগে ঈদ্গাহে যাওয়া- ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঈদ্গাহে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া এবং আগে আগে ঈদ্গাহে উপস্থিত হওয়া সুন্নাত।

৪) মিসওয়াক করা, গোসল করা ও পরিপাটি হওয়া- ঈদের দিন মিসওয়াক করা গোসল করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাত।

৫) বেজোড় সংখ্যক খেজুর বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেয়ে ঈদ্গাহে যাওয়া- ঈদ্গাহে যাওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন (৩/৫/৭ ইত্যাদী)। তাই আমরা ঈদ্গাহে যাওয়ার আগে খেজুর ও মিষ্টি জাতীয় খাবার খেয়ে ঈদ্গাহে যাবো ইনশাআল্লাহ্‌।

৬) পায়ে হেঁটে ঈদ্গাহে যাওয়া- যানবাহন ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে ঈদ্গাহে যাওয়া সুন্নাত। তবে অসুস্থতা বা অন্য কোন বিষয় থাকলে ভিন্ন কথা।

৭) ঈদ্গাহে যাওয়া ও আসার পত ভিন্ন করা- ঈদ্গাহে যে পথ দিয়ে যাবে আসার সময় অন্য পথ দিয়ে আসা সুন্নাত। যদি বিকল্প রাস্তা না থাকে সেক্ষেত্রে যাওয়ার সময় রাস্তার এক পাশ দিয়ে যাবো ও আসার সময় অন্য পাশ দিয়ে আসবো। তাহলে এই সুন্নাত আমাদের আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্‌।

৮) উন্মুক্ত স্থানে ঈদের নামাজ আদায় করা- আবদ্ধ স্থানে বা মসজিদের ঈদের নামাজ আদায় না করে উন্মুক্ত স্থানে ঈদের নামাজ আদায় করা সুন্নাত। তবে বৃষ্টি বা অন্য কোন সমস্যা থাকলে মসজিদে পড়া যাবে।

৯) ঈদের নামাজের পর খুৎবা শোনা- জুম’আর নামাজের খুৎবা হয়া নামাজের আগে আর ঈদের নামাজের খুৎবা হয় পরে। ঈদের নামাজের পর এই খুৎবা শোনা আমাদের জন্য ওয়াজিব। আমরা চুপ করে খুৎবা শুনবো ইনশাআল্লাহ্‌।

১০) ঈদের দিন যথা সম্ভব হাসিখুশি থাকা- ঈদ আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি খুশির দিন। তাই এদিন হাসিমুখে থাকা ও আনন্দিত থাকাও একটি ইবাদত।

১১) ঈদের দিন একে অন্যকে অভিভাদন জানানো- ফোনে, ম্যাসেজে কিংবা দেখা হলে আমরা একে অন্যকে অভিভাদন জানাবো। সাহাবীগণ (রাঃ) ঈদের দিন দেখা হলে পরস্পরকে সুন্দর একটি দোয়া করার মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। দোয়াটি হল –تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَ مِنْكُمْ উচ্চারণ : ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।
অর্থ : ‘আল্লাহ তাআলা আমাদের ও আপনার নেক আমল তথা ভাল কাজগুলো কবুল করুন।’

ঈদ সম্পর্কিত ৩ টি ভুল ধারণা

১) ঈদের দিন কবর যিয়ারতকে সুন্নত মনে করাঃ যে কোনো দিনই কবর যিয়ারত করা যেতে পারে কিন্তু বিশেষ করে ঈদের দিন কবর যিয়ারতকে সুন্নত বা বিশেষ সওয়াবের কাজ বা বিশেষ ভাবে করণীয় মনে করা ভুল। আমরা আমাদের আবেগের জায়গা থেকে প্রিয়জনেরা যারা কবরবাসী হয়ে গিয়েছেন তাদের জন্য দুআ করতে ঈদের দিন কবর যিয়ারত করতে যাই। মৌলিক ভাবে ঈদের দিন কবর যিয়ারত করতে যেতে কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু এমনটা মনে করা যাবে না বা এমন Intention রাখা যাবে না যে, ঈদের দিন কবর যিয়ারত করলে বিশেষ কোনো ফজিলত বা বিশেষ কোনো সুন্নত পালন হলো।

২) কোলাকুলি করাকে সুন্নত মনে করাঃ কোনো মুসলিম ভাইয়ের সাথে অনেক দিন পর দেখা হলে মুআনাকা বা কোলাকুলি করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি ঈদের দিনের জন্য খাস বা বিশেষ কোনো আমল নয়। ঈদে বাড়িতে গিয়েছি বা ঈদের দিন কোনো আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুর সাথে অনেক দিন পর দেখা হলো তার সাথে সম্প্রীতি ও ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে কোলাকুলি করতেই পারি। এটা অন্য সময়ের পর সাধারন কোলাকুলি। ঈদ উপলক্ষ্যে কোলাকুলি করাকে বিশেষ আমল বা সুন্নত মনে করাটা ভুল।

৩) ঈদের দিন নতুন জামা পরাকে সুন্নাহ মনে করাঃ ঈদের দিন সংগ্রহে থাকা জামাগুলোর মধ্যে উত্তম জামাটি পরিধান করা সুন্নাহ। সেটা নতুন কেনা হতে পারে বা পুরাতনও হতে পারে। উত্তম জামা পরিধানের আমল করার জন্য নতুন জামাই হতে হবে এটা জরুরি নয়। বরং যে জামাটি সবচেয়ে ভাল আমরা চেষ্টা করব সেটি পরার জন্য। তা নতুন বা পুরাতন যাই হোক না কেন।

ঈদ উদযাপনে কতিপয় হারাম কাজ

সারা মাস আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী শেষে ঈদের দিনটা অনেকে উদযাপন করেন হারাম কার্যক্রমের মাধ্যমে। তাদের জন্য সমবেদনা। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হারাম কাজ ধরা হলো।

১) গান-বাজনার মাধ্যমে ঈদ উদযাপন- এটি অন্য সময়ে যেমন হারাম, ঈদের দিনেও হারাম। মহল্লায় মহল্লায় দেখা যায় ঈদের আগের রাত থেকে সারা রাত ভর উচ্চ শব্দে গান বাজানো হয়। কোনো রুচিশীল মানুষের পক্ষে এটা শোভা পায় না।

২) পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা অন্যান্য দিনের মত ঈদের দিনেও হারাম। পুরুষদেরকে অন্য সময়ের মত ঈদের দিন নজরের হেফাজত করতে হবে আরো বেশি। আর নারীদেরও উচিত বেহুদা গুনাহ কামানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করে ঘুরে না বেড়ানো।

৩) সালাত ছেড়ে দেয়া অন্যান্য সময়ে যেমন হারাম, ঈদের দিনেও হারাম। তাই কোনো অবস্থাতেই আনন্দ উল্লাসে মেতে সালাতের কথা যেন ভুলে না যাই।

আল্লাহ আমাদের ঈদ উদযাপনকে ইবাদতের মাধ্যম বানিয়ে দিন। সকল প্রকার হারাম ও অশালীন কাজ থেকে আমাদেরকে হেফাজত করুন। রামাদানের উদ্দেশ্য ছিল আমাদেরকে মুত্তাকী বানানো। ঈদের দিন ও পরবর্তী সারা বছর যেন আমরা মুত্তাক্বী হিসাবে জীবন-যাপন করতে পারি সেই তাওফিক আল্লাহ দান করুন। আমীন

তথ্যসুত্র ও কন্টেন্ট কার্টেসি-

মুসলিম ডে এপ ও হাসান ভাই

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *