চা-শ্রমিকদের আন্দোলন ও ইসলামে শ্রমিকের অধিকার

চা-শ্রমিকদের আন্দোলন ও ইসলামে শ্রমিকের অধিকার

ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা হাতে শুরু হয় আমাদের দিন। চা পান করে দৈনিক পত্রিকা পড়ি বা কোরআন তেলাওয়াত করি। কখনও কর্মক্লান্ত হলে শরীরে বাড়তি এনার্জির জন্য বা বন্ধুদের সাথে আড্ডায়ও চলে চায়ের আয়োজন। রাস্তার পাশে, পার্কে, বিনোদন স্পটে, অফিস আদালত, কর্পোরেট সংস্থা থেকে নিয়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও প্রতিটি স্থানে প্রতিদিন প্রয়োজন পড়ে চায়ের।

কিন্তু যাদের শ্রম ও ঘামে আমরা মহান আল্লাহর এই দারুণ পানীয় গ্রহণ করি, এক জীবনে হয়ত তাদের কথা ভাবার ফুরসত হয় না। কয়েকশ বছর ধরেই আমাদের দেশে চায়ের উৎপাদন চলছে। হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে উঠেছে চা পাতাকে কেন্দ্র করে। একটি কুঁড়ি দুটি পাতা আমাদের মনপ্রাণ যেভাবে সজীব ও স্পন্দিত করে অন্য কোনো পানীয় সেভাবে সজীবতা আনতে পারে না। গত ১৪ আগস্ট থেকে চা পাতা শ্রমিকদের আন্দোলন এই প্রথম আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে গেল যেন। আমরা জানতে পারলাম, যাদের রক্ত পানি করা শ্রমে আমরা অনন্য স্বাদ ও গন্ধের চা মুখে তুলি তাদের সারাদিনের দুঃসহ খাটুনির মূল্য মাত্র ১২০ টাকা। চা পল্লিতে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানবেতর জীবনযাপন করে যাচ্ছে। এই আধুনিক যুগেও তারা পড়ে আছে আদিম দাসত্বের নিগড়ে বন্দি হয়ে।

দেশের আর দশজন নাগরিকের মত নেই তাদের মৌলিক কোনো অধিকার। আমরা যে এত ইসলামের কথা বলি, আমাদের দেশে ইসলামি মূল্যবোধগুলো এভাবে বিনষ্ট হতে দেখি তাতে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা হয় না। চা শ্রমিকরা মাত্র তিনশ টাকা মজুরির জন্য আন্দোলন করছে, একবার ভেবে দেখেছেন, কত কম তাদের চাওয়া? কত স্বল্পতে তারা তুষ্ট? এখানেও অনেকে পাচ্ছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। অনেকেই মন্তব্য করছেন, চা শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য এই আন্দোলন দাঁড় করানো হয়েছে। সত্যি দুঃখজনক, লাখ লাখ শ্রমিককে বছরের পর বছর গোলামের মত খাটিয়ে যদি এই শিল্প দাঁড় করিয়ে রাখতে হয় তাহলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না।

প্রতিটি নাগরিকের অধিকার আছে সুস্থ সুন্দরভাবে বাঁচার। ইসলাম সাম্যের কথা বলে, অধিকারের কথা বলে। স্বাধীন মানুষকে দাস বানিয়ে রাখা ইসলামে কোনোভাবেই সমর্থিত নয়। আজ থেকে ১৪শ’ বছর আগে প্রিয় নবীর একান্ত ঘনিষ্ঠ সাহাবি ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর তার ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন, কবে থেকে তোমরা মানুষকে দাস বানিয়ে রাখা শুরু করলে, অথচ তাদের মায়েরা তাদেরকে স্বাধীনভাবেই প্রসব করেছে। জন্মেছে স্বাধীনভাবে, এই স্বাধীনতা তার মৌলিক অধিকার। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থান প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার, ইসলামে এই মৌলিক অধিকার রক্ষার নির্দেশ রয়েছে। চা শ্রমিকরা অধিকাংশই হিন্দু বা খৃস্টান, এ জন্যই কি আমাদের এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই? অথচ মৌলিক অধিকার কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, মুসলিম অমুসলিম ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের এই সুরক্ষা অধিকার রয়েছে।

নিপীড়িত মানুষের বন্ধু ইসলাম। পৃথিবীর আর কোনো মতাদর্শ এর চেয়ে বেশি সম্মান দেয়নি দিনমজুরদের। মালিক ও মজুরে কোনো তফাৎ নেই ইসলামে। মালিকের যেমন সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার আছে মজুরেরও আছে স্বাধীন সত্ত্বা লাভের অধিকার। শোষণ ও নিপীড়নের পথ বন্ধ করতে চায় ইসলাম। দুর্বলকে পিষে খতম করার জঘন্য প্রবণতা দূর করতে চায় ইসলাম।

মহানবী (সা.) অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করেছেন, প্রত্যেকের অধিকার আদায় করে দাও। (বুখারী শরীফ) অধিকার আদায়ের বেলায় কোনো ধরনের শিথিলতা সহ্য করেনি ইসলাম। ইসলামের দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি নিজের অধিকার সংরক্ষিত রাখতে গিয়ে মারা যাবে সে শহীদ হবে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিজের অধিকারস্থ সম্পদ সংরক্ষিত রাখতে গিয়ে নিহত হবে সে শহীদ। (বুখারি শরিফ)।

শ্রমিকের অধিকারের ক্ষেত্রে ইসলামের বক্তব্য খুব স্পষ্ট। মজুরি নির্ধারণ করতে হবে শ্রমিকের প্রয়োজন অনুসারে। অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রমিককে কমপক্ষে এমন মজুরি দিতে হবে যেন সে তার ন্যায়ানুগ ও স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। রাসূল (সা.) বলেন, অধীনস্থদের খোরপোষ দিতে হবে। (মুসলিম শরিফ) তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদেরকে পরিতৃপ্ত করে দিবে। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

হযরত উমর (রা.) এইভাবে খোরাকি নির্ধারণ করতেন যে, সুস্থ সবল ভালো খেতে পারে এমন কয়েকজনকে ডাকিয়ে এনে খেতে দিতেন। তাদের খাবারের অনুপাতে শ্রমিকদের খাবার নির্ধারণ করতেন। (ফুতুহুল বুলদান) হযরত উমর তার খিলাফত আমলে কর্মচারীদেরকে তাদের প্রয়োজন এবং যে শহরে বাস করবে তার পারিপার্শ্বিকতা অনুযায়ী ভাতা দিতেন। (কিতাবুল আমওয়াল)

এই সব হাদিসের উদ্ধৃতি দেখুন তারপর সিলেট হবিগঞ্জ চট্টগ্রাম রাঙামাটি প্রভৃতি স্থানের চা বাগানের শ্রমিকদের ক্লিষ্ট ক্ষুধার্ত হাড় জিরজিরে রোগগ্রস্ত মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে বিচার করুন। নিঃস্ব অসহায় দরিদ্র শ্রমিকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদেরকে নিম্নতম চুক্তিতে আবদ্ধ করে দাসত্বের নিগড়ে বন্দি করে রাখা মানবতার জন্য কতটা হানিকর। চা শিল্পীদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা তো দূরের কথা প্রাইমারি শিক্ষা থেকেও তাদের বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে। এভাবে কেটেছে অনেক সময়। মুখ বুজে সয়ে গেছে এই কষ্ট। সব কিছুর দাম বেড়েছে, দ্রব্যমূল্য বাড়লেও এই মানুষগুলোর দাম যেন দিন দিন কমছে। অন্য সব শ্রমিকরা যেখানে ন্যূনতম ৮শ’ টাকা পারিশ্রমিক পায় সেখানে তাদের চেয়েও বেশি খেটে চা বাগানের শ্রমিকরা লড়াই করছে ৩শ’ টাকার জন্য। ৩শ’ টাকার স্থলে দেড়শ’ টাকা হলেও হয়ত তারা মেনে নেবে।

এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবেই উদ্যোগ গ্রহণ করে শ্রমের ন্যায়সংগত মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া আবশ্যক। হযরত উমর (রা.) তার যুগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই মজুরি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। মালিক ও শ্রমিক কোনো কিছু পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্মতি দিলেই তা বৈধ হয়ে যায় না। অন্যের হাতে খুন হয়ে যাওয়ার সম্মতি দিলেই খুনি তার খুনের অপরাধ থেকে মুক্তি পেতে পারে না। তেমনি অবস্থার চাপে পড়ে কেউ কোনো ব্যাপারে সম্মতি দিয়ে দিলেও তার উপর জুলুম চালানোর এখতিয়ার কোনো মালিকের হতে পারে না। এই আন্দোলন এজন্য কেবল চা শ্রমিকদের নয়, সুশীল শ্রেণি ও সাধারণ নাগরিক সমাজের প্রত্যেকেরই উচিত ন্যায়সঙ্গত মজুরি নির্ধারণের জন্য আওয়াজ তোলা। আমাদের চোখের সামনে লাখ লাখ শ্রমিককে দাস বানিয়ে রাখা হবে আর আমরা চোখ বুজে থাকব তা কখনোই হতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের মালিকপক্ষকে সুবোধ নসিব করুন। আর আমাদের সবাইকেই তাওফিক দিন দুঃস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মী ও সমব্যথী হতে। আমিন।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *