বিশ্ববিখ্যাত এই বিজ্ঞানী উলুঘ বেগ নামেই পরিচিত। তাঁর আসল নাম মুহাম্মাদ তারাঘাই ইবনে শাহরুখ ইবনে তৈমুর। জন্ম ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ছিলেন মধ্য এশিয়ার দিগ্বিজয়ী তৈমুর লংয়ের দৌহিত্র। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও জ্ঞানপিপাসু। কিশোর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআন হেফজ করে ফেলেন। এরপর ধর্মশাস্ত্র, ইতিহাস, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় তিনি বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জনে সক্ষম হন। শিল্প, সাহিত্যের প্রতিও তাঁর ভালোবাসা ছিল প্রগাঢ়। তাঁর বাবা (তৈমুরপুত্র) শাহরুখও ছিলেন জ্ঞানপিপাসু।
যদিও তিনি বিজ্ঞানী ছিলেন না, বিজ্ঞান চর্চার প্রতি আত্মিক টান ছিল। ফলে পুত্র উলুঘ বেগকে তিনি বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্মশাস্ত্র ও আর্ট সম্বন্ধে বিশেষ শিক্ষাদান করেন। যুবরাজ উলুঘ বেগও ছিলেন বাবার মতোই জ্ঞানানুরাগী। তুর্কিস্তান ও ট্রান্স অক্সিয়ানার শাসনকর্তা থাকাকালে শত ব্যস্ততার মাঝেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। তিনি। জ্যোতির্বিজ্ঞান, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি প্রভৃতিসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি সুদক্ষ ছিলেন।
জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনায় নিজে যেমন ডুবে থাকতেন, অন্যদেরও উৎসাহ দিতেন। পিতা শাহরুখের মৃত্যুর পর তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। যুবরাজ উলুঘ বেগ হয়ে যান সম্রাট উলুঘ বেগ। তাঁর আমলে সমরকন্দ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা লাভ করে। তিনি সমরকন্দে সুউচ্চ গম্বুজের বহু খানকা ও বহু মসজিদও নির্মাণ করেন। ১৪২০ সালে তিনি সেখানে এক বিশাল মানমন্দির স্থাপন করেন। এসব নির্মাণকাজে তাঁর গভীর স্থাপত্যবিদ্যা ও শিল্পকলার স্বাক্ষর বর্তমান ছিল।
তাঁর গবেষণাপত্র ‘জিজ-ই-জাদিদই-মুলতানি’ বেশ পরিচিত। এতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ১. বিভিন্ন গণনা ও বর্ষ, ২. সময়জ্ঞান, ৩. নক্ষত্রের গতিপথ, ৪. স্থির নক্ষত্রের অবস্থান প্রভৃতি সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। তালিকাটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সর্বত্রই বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। Ulugh Beg’s Table নামে এখনো তা বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এতে পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন তথ্যফলসহ তাঁদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ফলাফলও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই জিজ তৈরির কাজে সালাউদ্দীন মুসা, মোল্লা আল-কুশজি, পিয়াসউদ্দিন জামশিদ, মইনুদ্দিন কাশানী, কাজিজাদা রুমি প্রমুখ তাঁর সহকর্মী ছিলেন।
সপ্তদশ শতাব্দীতে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক গ্রিভস তালিকাটির প্রতি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মি. হাইড এর লাতিন অনুবাদ করেন। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে শার্প এই অনুবাদের অন্য একটি সংস্করণ প্রকাশ করেন। ১৮৪৭-৫৩ খ্রিস্টাব্দে মি. মেডিলো এর উপক্রমণিকার অনুবাদ প্রকাশ করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জয়পুর রাজ্যের মহারাজ জয়সিংহ উলুঘ বেগ প্রণীত নক্ষত্র তালিকার অনুবাদ প্রকাশ করে রীতিমতো গবেষণা শুরু করেন।
সম্রাট বিজ্ঞানী উলুঘ বেগের তালিকায় শুদ্ধ জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধেও বিস্তারিত আলোচনা ‘আরবাই চেঙ্গিস’ চেঙ্গিসের চার পুত্র গ্রন্থ রচনার মধ্যে তাঁর অগাধ জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। মি. মেডিলোর মতে উলুঘ বেগের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই প্রাচ্যের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চাও শেষ হয়ে যায়।
ত্রিকোণমিতির সাইন, কোসাইন, ট্যানজেন্ট প্রভৃতি পূর্বাবিষ্কৃত বটে; কিন্তু সবই ছিল এলোমেলো, প্রক্ষিপ্ত। উলুঘ বেগই প্রথম বিজ্ঞানীদের সুবিধার জন্য এসব সংগ্রহ করে তালিকাভুক্ত করেন। এর আগে কোনো বিজ্ঞানীই তা করেননি। এই তালিকায় তাঁর মৌলিক অবদান ছিল ব্যাপক। তিনি বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সেসব মুদ্রিত ও পাণ্ডুলিপি অবস্থায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়। ১৪৪৯ সালে উলুঘ বেগের মৃত্যুর মাধ্যমে প্রাচ্যের এই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ সম্রাটের কর্মময় জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
তথ্যঋণ : সেরা কজন মুসলিম বিজ্ঞানী, পৃ. ১৪, সেরা মুসলিম বিজ্ঞানী, পৃ. ১১৫,-ইন্টারনেট